গল্প ৩ঃ মহাপ্রলয়ের আগে

 

আরো একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন সকাল।

ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ জানলার পর্দাটার দিকে চেয়ে রইলাম। জানলার ওপাশে কি আছে আমি জানি। তবু, প্রতি সকালে একবার প্রার্থণা করি যেনো ভিন্ন কিছু দেখি। হাত দিয়ে পর্দাটা সড়ালাম, জানলাটা যথারীতি ঘোলাটে। ওপাশে সাদা ঘন কুয়াশা। ২০ হাত দূরের কিছু দেখা যায়না। রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়া গাড়ির শব্দ শুনি, ফেরিওয়ালার ডাক শুনি- কিন্তু ঘন কুয়াশায় আড়ালে ওরা সবাই অদৃশ্য। জানলাটা আবারো বন্ধ করে ক্লান্ত ভঙ্গিতে শুয়ে থাকি। সব নিশ্চুপ। কোনো গতি নেই, কাজ নেই। চারদিকে কেবল স্থিরতা। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে স্বশরীরে ক্লাস বন্ধ। এখন সব ক্লাস অনলাইনে হচ্ছে। কেবলই ঘরে শুয়ে বসে সময় কাটানো। মাঝেমধ্যে ছাদে যাই, একটু হাঁটাহাঁটি করার চেষ্ঠা করি। কিন্তু সেখানেও শূন্য আর রিক্ততা। ফুল গুলো মরে ঝরে পড়ে আছে নিচে। গাছের সবুজ পাতা রঙ হারিয়ে ধূসর প্রায়। আকাশে কোনো রঙের খেলা নেই, কেবলই একঘেয়ে বিষন্ন ঘিয়ে কালারের আকাশ। এমনকি চারপাশে শব্দও কমে গেছে- মানুষ আজকাল খুব একটা কথা বলেনা। যেনো সবাই ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। প্রকৃতির কুয়াশা গায়ে জড়িয়ে সবাই নির্বাক, নিশ্চুপ হয়ে গেছে। কোথাও কেউ নেই, কিচ্ছু নেই- সাদাটে কুয়াশা আর মেঘলা আকাশ।

 

সূর্য না ওঠার ৭৭৬ তম দিন আজ। অর্থাৎ, এ পৃথিবী সর্বশেষ সূর্যের দেখা পেয়েছিলো ৭৭৬ দিন আগে। সেদিন ছিলো বুধবার। অনেক উজ্জ্বল একটা দিন ছিলো। বাচ্চারা খেলা করছিলো রাস্তায় কিংবা মাঠে, লোকেরা ব্যস্ত ভঙ্গিতে অফিসে গিয়েছিলো সেদিন সকালেও, ‘উফ! কী রোদ বলে’ চেহারা রোদ থেকে আড়াল করেছিলো কোনো এক কিশোরী, গৃহিনীরা কাজ শেষে হয়তো বারান্দায় বসেছিলো- কেউই জানতো না এটা তাদের শেষ রোদ গায়ে মাখা। সে রাত টাও স্বাভাবিক ছিলো। পরের দিন স্বাভাবিক সময়েই সকলে ঘুম থেকে উঠলো, আলো না দেখে তারা ভেবেছিলো আসন্ন ঝড়-বৃষ্টি্র আভাস। সেদিন সারা সকাল আর দুপুর সূর্যের দেখা পাওয়া গেলো না। এরপরের দিনেও না, এরপরের দিনটাতেও না। বরং সূর্যহীন এক সকালে হঠাতই দেখা মিললো কুয়াশার। এটা তো শীতের মৌসুম নয়- তবে? পুরো পৃথিবীর মানুষ অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলো সবখানে একই অবস্থা। একই কুয়াশার চাদর সবাইকে ক্রমেই ঘিরে ধরলো। শুরুতে তা গভীর ছিলোনা; কিন্তু দিনে দিনে সে কুয়াশা ঘন থেকে ঘনতর হতে লাগলো। আকাশটাও হয়ে উঠলো মেঘলা। একদিন নয়; দিনের পর দিন এই কুয়াশাচ্ছন্ন মেঘলা আকাশ উপরে রেখে দিন কাটাতে লাগলো সকলে। পুরো পৃথিবীজুড়েই এই উতপাত চলতে থাকলো। ধীরে ধীরে সমস্যা প্রকট থেকে প্রকটতর হলো। পরিবেশের ইকোসিস্টেমে ব্যাঘাত ঘটলো, বায়োডাইভার্সিটি হুমকির মুখে পড়লো। মানুষের স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিলো, নানাপ্রকার রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে লাগলো। পরিবারে দাম্পত্য কলহ বাড়লো, মানুষের মাঝে একাকীত্বের প্রবণতা দেখা দিলো। সমাজে বিয়ের হার কমলো, বাচ্চা জন্মদানের হার কমে গেলো দ্রুতই। অর্থনৈতিকভাবে ভারসাম্যহীনতা সবখানে। পৃথিবীজুড়ে অদ্ভুত অসামঞ্জস্যতা দেখা দিলো। চারদিকে বিশৃঙ্খলা, সবাই অস্থির। সবাই বিষন্ন, সকলেই হতবিহ্বল। মাসের পর মাস এভাবে কাটার পর লোকেরা মানসিক অসুখে ভুগতে শুরু করো। হাসির শব্দ এখন আর শোনাই যায়না, খাবার টেবিলে যেনো কিছু লাশ চুপচাপ খেয়ে যায় কেবল। কোনো উতসাহ নেই, নেই কোনো উদ্দীপনা। যেনো কবিতায় পড়া সেই অবস্থা- নষ্ট খেত, নষ্ট মাঠ, নদী নষ্ট, বীজ নষ্ট-বড় নষ্ট সংসার

 

চারদিক জুড়ে যখন বিষন্নতার মিছিল, তখন অকস্মাত আমার জীবনে দেখা দিলো সূর্য। ‘প্রিয় মুনা’। এ নামেই তার সাথে পরিচয় আমার। আমাদের পরিচয়টা সোশ্যাল সাইটের সূত্র ধরে। তখন বেশিরভাগ সময় কাটছিলো মোবাইলে বুদ হয়ে থেকে। ‘স্লোলি’ নামক এক সোশ্যাল সাইটে একাউন্ট খুলি, সেখানে এনোনিমাসলি চিঠি চালাচালি করা যায়। এক রাতে আমার ওপেন লেটারের জবাবে এক মেয়ের আইডি থেকে চিঠি আসলো। ‘অপরিচিতমেষু’- এই ছিলো তার সম্বোধন। তার আইডির নাম ছিলো ‘প্রিয় মুনা’। পরের চিঠিতে আমি জানতে চাইলাম, ‘প্রিয়’ সম্বোধনটা তার খুব প্রিয় কী না। সে জানালো, হ্যাঁ। তবে অপরিচিত কারো থেকে ‘প্রিয়’ শুনতে বড্ড ফাঁপা লাগে। ক্রমেই, মুনা আদতেই প্রিয় হয়ে উঠলো আমার। আমাদের ব্যক্তিগত ডাকবাক্সে প্রতিদিন চিঠি জমা হতে লাগলো। সেখানে সারাদিনের গল্প জমা হয়। জমা হয় আমাদের ভালোলাগার কথা। জানলার ওপাশে কুয়াশা দেখতে দেখতে মুনা লিখে রোদের গল্প। লেখে ঝর্ণা, পাহাড় আর সমুদের গল্প। আমি বলি মুরাকামির বইয়ের কথা, বলি মহীনের ঘোড়াগুলি আর চন্দ্রবিন্দুর প্রতি ভালোলাগার গল্প। ‘আপনার চিঠিতে এত এত লেখকের মাঝেও আমার প্রিয় শীর্ষেন্দুর নাম না দেখে একটু হতাশ হলাম’, বলে মেয়েটি। আমি ভাবতে থাকি, একবার পৃথিবীটা ঠিক হোক- শীর্ষেন্দু পড়তেই হবে। বুঝতে হবে কেনো মুনা তাকে এত ভালোবাসে। মুনাকে বুঝতে চাই আমি, তার চিঠি গোগ্রাসে গিলি, কল্পনায় দেখি মুনা বলে চলেছে আর পাশে চুপ করে বসে গালে হাত দিয়ে আমি শুনছি। জানলার ওপাশের গ্লুমি আবহাওয়াকে ঢেকে দিয়ে মুনা সেখানে সন্ধ্যার লালচে আভা এনে দিলো। বহু দিন পর আমি সন্ধ্যায় লালচে মেঘ দেখতে দেখতে ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘলামা’ শোনা শুরু করলাম। প্রতিদিন চিঠি আদান-প্রদান হয় আমাদের। নিজ নিজ জীবনের গল্প করি আমরা। সাথে সেখানে চলে আসে পরিবার, সমাজ, দেশ আর নিজেদের স্বপ্নের গল্প।

 

কেবল চিঠিতেই যোগাযোগ হয় আমাদের। নিজেদের ভেতরের গল্পগুলো বলতে বলতে যেনো খুব কাছাকাছি চলে আসি। আমরা দুজন একই শহরের দুই প্রান্তের বাসিন্দা। আমি জানতে চাই, আমাদের কী দেখা হবে কখনো? মুনা উত্তর দেয়, ‘হয়তো’। আমি আর জোর করিনা।

 

ধীরে ধীরে অনেকদিন সময় পেরিয়ে যায়। ক্রমেই অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে। কুয়াশার স্তর ঘন থেকে ঘনতর হয়, আকাশ আরো ঘন কালো হতে থাকে। পুরো পৃথিবীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়ে। আমাদের চিঠির মধ্যেও হতাশা ঝরে পড়ে। তবু এই দুর্যোগের মধ্যে আমরা দুজন মানুষ শহরের দুই প্রান্ত হতে একজন আরেকজনকে লিখে যাই। মুনার চিঠি পড়ে পড়ে আমি ভুলে থাকি জীবনের অনিশ্চয়তা, বসন্তের প্রলেপ দিয়ে ঢেকে রাখি নিজেকে।

 

অবস্থা যখন আরো খারাপ হতে লাগলো, তখন এক সকালে দেখলাম দেশে জরূরী অবস্থা জারি হতে যাচ্ছে। সমস্ত স্কুল, কলেজ ছুটি ঘোষণা করা হলো। সরকারি চাকুরীজীবীদের বাসা থেকে অফিস করতে বলা হলো। সবাই ছুটতে লাগলো বাড়ির দিকে। মুনা জানালো, সে বাড়ি যাবে। যত দ্রুত সম্ভব। আমি চিঠি পড়ে অস্থির বোধ করতে থাকি। আমাদের কী কখনো দেখা হবেনা?  ঘরময় পায়চারি করতে থাকি আমি। মুনা জানায়, পরের দিন সে বাড়ি যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

 

সেদিন সকাল থেকেই আকাশ ছিলো ভয়ঙ্কর রকমের গম্ভীর। দুপুর থেকে কুয়াশা ঝরে পড়তে লাগলো। যেনো কোনো মহাপ্রলয় আসন্ন। সেদিন রাস্তায় ভীষণ ভীড়, একের পর এক যাত্রীবোঝাই গাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে শহর ছেড়ে। ওদিকে মোবাইল নেটওয়ার্কও ধ্বসে পড়েছে। বেশ কয়েকবার চেষ্ঠার পর মুনাকে ফোনে পাই, কয়েকবার হ্যালো হ্যালো করবার পর মুনা আমার কথা শুনতে পায়। ‘কখন বের হবা তুমি?’, জানতে চাই। ‘এইতো, এখনই। কেনো?’, মুনা জিজ্ঞেস করে। সে জবাব দেবার আগেই ফোনটা কেটে যায়। আমি কয়েক মুহূর্ত স্তদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ছুটে বেড়িয়ে পড়ি। মুনার বাড়ি ফেরার রাস্তা আমি জানি। সে পথে গিয়ে দাঁড়াই। আশ্চর্য ব্যাপার, তুষার ঝরে পড়তে থাকে আমার উপর। আমার গায়ে, কাঁধে আলতো তুষার জমা হয়। মুনাকে আবারো কল দিই, সে কল পৌঁছায় না। গাড়িতে উঠে বসি, বাসট্যান্ডের দিকে যেতে থাকি। বারবার কল দিতে দিতে অবশেষে তাকে পাই, জানতে চাই মুনা এখন কোথায়। ‘গাড়িতে আমি। গাড়ি ছেড়ে দিসে।’ মুনা বলে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় আমার। কিছু না বলে ফোন কেটে দিই। আমার বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসা প্রতিটা গাড়ির পিছনের সীটে চোখ দিয়ে রাখি। মুনা এই পথ দিয়ে যাবে। আমার আশেপাশের সমগ্র পৃথিবী নিশ্চুপ হয়ে আছে, কোনো শব্দ কানে আসেনা। পর্দার দৃশ্যের মতো একের পর এক গাড়ি সাই সাই করে চলে যায় পাশ দিয়ে, প্রতিটা গাড়ির দিকে চেয়ে রই। আমি আমার গাড়ির ড্রাইভারের পাশের সীটে বসে মাথা বের করে অপেক্ষা করি, এ পৃথিবীতে শুধু আমার নিঃশ্বাসের শব্দই বিদ্যমান। এ সমগ্র পৃথিবীতে এ মুহূর্তে কেবল একটা বিষয়ই জরূরী- একটা গাড়ি, যেখানে মুনা আছে। পুরো পৃথিবীর বিনিময়ে হলেও আমি সে গাড়িটা পেতে চাই। এরপর যা হয় হোক। মোবাইলটা বের করে গ্যালারীতে চুপ করে বসে থাকা মেয়েটাকে দেখি- শাড়ী পড়া একটা মেয়ে, নৌকায় বসে নদীর পানে চেয়ে। আমি অপেক্ষা করি সে মেয়েটাকে দেখবার জন্য, যার ঘন কালো চোখ দুটো মোটা ফ্রেমের চশমায় ঢাকা থাকে। বিপরীতদিক থেকে আসা প্রতিটা গাড়িই মুনার সম্ভাব্য দূত হয় ছুটে বেড়িয়ে যায় আমার পাশ দিয়ে। কিন্তু কোথায় মুনা? কোনো গাড়িতে বোরকা পড়া নারী, কোনো গাড়িতে কেবলই পুরুষঠাসা। নিঃশ্বাস আটকে আমি বসে থাকি। মুনা কী তবে চলে গেলো?

 

কিছু কুয়াশা যেনো আমার চোখে জমা হতে থাকে। সেই কুয়াশা মুছবার আগেই এক মুহূর্তের জন্য আমার পৃথিবীটা থমকে যায়। আমার চোখ খুঁজে পায় ভারী ফ্রেমের চশমার মেয়েটাকে। যার চুল মাঝখান দিয়ে সিঁথি করে দু পাশে রাখা। যার চোখেমুখে খেলা করে একটা কনফিউজিং লুক। যাকে ছবিতে দেখেছি বহুবার, বহুরকম ভাবে। ভার্চুয়াল জগতের সেই মুনা, আমার ‘প্রিয় মুনা!’  মেরুন কালারের একটা ঝড় তুলে সে বেড়িয়ে যায় আমার পাশ দিয়ে। জানলার ওপাশে তাকে এক মুহূর্তের জন্য দেখতে পাই আমি, মাথা ঘুরিয়ে চেয়ে থাকি তার অতিক্রান্ত পথ পানে।

 

গাড়িটা মাঝপথে থামিয়ে আমি নেমে পড়ি। ড্রাইভার বিস্মিত হয়ে চেয়ে থাকে। সে চাওয়া অগ্রাহ্য করে আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে হাটি। ততক্ষণে ভারী তুষারপাত শুরু হয়েছে। সামনে হয়তো মহাপ্রলয় আসতে চলেছে, প্রলয় এসেছে অতীতেও। চারশ বছর ধরে প্রলয় চলছে বৃহস্পতির বুকে, তার তুলনায় এ প্রলয় বড় তুচ্ছ। চিরকাল ঝড় বয়েই এসেছে এই জীবনে- তার মাঝে এই বিষাদময় বিকেলে একটা মেরুন ঝড়ের মিষ্টি ঝাপটা চোখেমুখে মেখে আমি হাঁটতে থাকি। মহাপ্রলয় সব ভাসিয়ে নিয়ে যাক, আমার আর কিচ্ছু চাওয়ার নেই।

Comments

Popular Posts