বইঃ পদতলে চমকায় মাটি
'এইখানে মানুষ বাঁচতে পারে? খোলা জায়গা কই?'- এই বাক্য দিয়ে বইয়ের শুরু। অর্থাৎ, একটা সংলাপ দিয়ে। শামীম আজাদ নামে কেউ একজন এই অভিযোগ করছেন। ঠিক তার পরের লাইনে সমর নামে আরেক চরিত্রের উল্লেখ দেখা যায়, তার পরেই শান্তিপ্রিয়া। ধীরে-সুস্থে গল্পে ঢোকার অবকাশ না দিয়ে শুরু থেকেই বইটা ব্যস্ত ভঙ্গিতে এগুতে থাকে। অনভ্যস্ত মস্তিস্ক তাই শুরুতে বেশ প্যারা খায়। কে এই শামীম, কে এই সমর? পরের কয়েক পেইজ পড়ে বোঝা যায় এরা ফুটবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। যেখানে শামীম আজাদ একজন আগাগোড়া ফুটবলপ্রেমী, বর্তমানে যে কি না একটা ক্লাবের ম্যানেজার হিসেবে আছে। নিত্যনতুন খেলোয়াড় আবিষ্কার করা তার নেশা এবং তার নব্য আবিষ্কার রাঙামাটির ছেলে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমর চাকমা। সমরকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে ক্লাব ফুটবলে খেলাবার জন্য।
পাহাড়ের সন্তান সমর চাকমা যখন সমতলের বুকে ফুটবল খেলছে তখন ঢাকার সন্তান আরিফ আর হিমেল যায় পাহাড়ে- উদ্দেশ্য পাহাড়ে বিদ্যমান বাঙালি আর আদিবাসীদের মধ্যে চলে আসা সংঘাত আর সমস্যার উপর স্টাডি করা। তারা খুঁজতে চায় 'সত্য' আর বুঝতে চায় 'বাস্তবতা'। পাহাড়ি আর সেটেলার বাঙালির মধ্যকার প্রায় অর্ধশতবছর ধরে চলে আসা কনফ্লিটের উৎস, বাস্তবতা বুঝতে চায় ওরা। তাই তো ওরা ছুটে যায় দুই পক্ষের কাছেই। এক কালের পাহাড়ি সশস্ত্র বিপ্লবীর সাক্ষাতকার নেয় ওরা। আবার স্যাটেলার বাঙালি ব্যবসায়ীর সাথেও কথা বলে। শান্তিবাহিনীর কাছে প্রাণ হারানো এক মেজরের সহকর্মীর সাথেও তারা কথা বলে। হিমেল আর আরিফ পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে খুঁজে পায় নানা অবিশ্বাস আর জটিলতা।
বইয়ের শুরু থেকেই একেক পর এক চরিত্রের এন্ট্রি প্রথমেই বুঝিয়ে দিয়েছিলো বেশ বড় ক্যানভাসের গল্প বলতে যাচ্ছেন লেখক। হয়েছেও তাই। ৩৬৯ পৃষ্ঠার উপন্যাসে শামীম, সমর আর শান্তিপ্রিয়া ছাড়াও এসেছে আরিফ, হিমেল, বিজয়দের গল্প। সাহিত্যের মাত্রা ছাড়িয়ে ক্রমেই এই বইটা হয়ে ওঠে একটা রিসার্চ রিপোর্ট। আমরা পাঠকেরা খোঁজ পাই নানা অজানার। বইয়ের সবচে স্ট্রং পার্ট হচ্ছে পাহাড়ি-বাঙালি কনফ্লিক্টের গল্প বলতে গিয়ে লেখক এখানে বিভিন্ন জনের পার্সপেক্টিভ তুলে এনেছেন। কখনো একজন পাহাড়ি, কখনো সেটেলার বাঙালি কখনোও সরকারি আমলা আবার কখনো আর্মি অফিসার- প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে পাহাড়ে ঘটে আসা দীর্ঘদিনের সংকট নিয়ে বলেছেন। একে ওপরের দিকে তারা আঙুল তুলেছেন- অর্থাৎ, লেখক এখানে সবার পারসেপশন তুলে দিয়ে পাঠকদের স্বাধীনতা দিয়েছেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার; জোরপূর্বক কিছু চাপিয়ে দিতে চাননি। তাইতো অলস বিকেলে কিংবা মধ্যরাতে বইটা পড়তে গিয়ে বারবার থমকে গেছি, কখনো বই রেখে অস্থির পায়চারি করেছি। 'সমস্যাটা কী?' এই প্রশ্ন করেছি আর এরপরই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভেবেছি 'সমাধানটা কী?'
এ বই নিয়ে আমার ভালোলাগার সবচে বড় কারণ এর বিশাল ক্যানভাস আর এর ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্ট। পাহাড়ে কি হচ্ছে না হচ্ছে সেসব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান মূলত ফেসবুক। ৫ই আগস্টের পর পাহাড়ে ক্যাঁচাল আরো বেড়েছে। আর যতবার ক্যাঁচাল হতে দেখেছি ততবারই দেখেছি পাহাড়-বাঙালি কনফ্লিক্ট নিয়ে মেরুকরণ আরো তীব্র হচ্ছে। ঘৃণা দিনদিন আরো বাড়ছে। কিন্তু দিনশেষে ঘৃণা কেবল রক্তই বয়ে আনে। ভবিষ্যতে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে ঝামেলা আরো বাড়বে যদি না পাহাড়িদের সমস্যাগুলোকে, তাদের অভিযোগ গুলোকে শোনা না হয়, যদি না তাদের আরো ব্যাপক হারে মূলধারায় নিয়ে আসা না যায়।
বইয়ের শেষদিকে মনে হচ্ছিলো কিছুটা তাড়াহুড়ো করে শেষ করে দেওয়া। এছাড়া পুরো বইটাই মনের এবং মাথার খোরাক জোগাতে সক্ষম হয়েছে। লেখককে সাধুবাদ, এত চমৎকার ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়কে কেন্দ্র করে গল্পটা তুলে ধরবার জন্য।
রেটিংঃ ৪.৫/৫


Comments
Post a Comment