গল্প ২ঃ হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে
বারান্দায় থাকা হলুদ ফুলের গাছটা বাতাসে দুলছে।
সাধারণত ফুলের নাম অনীলের মনে থাকেনা। তবে এ ফুলটার নাম তার মনে আছে। গাছটা কিনেছিলো
তার স্ত্রী। ‘এটা কী ফুল, বলো তো?’, তার ঘন কাজলকালো চোখ দুটো স্থির রেখে জিজ্ঞেস করেছিলো
সে। এরপর উত্তরের অপেক্ষা না করে সাথে সাথেই ফুলের নামটা বলে দিয়েছিলো। ‘অলকানন্দা ফুল এটা। আমার এক ফ্রেন্ড এটাকে কি নামে ডাকতো জানো? কমলাকান্ত,
হিহি।’
অলকানন্দা বা কমলাকান্ত সম্পর্কিত
ভাবনা শেষ হলে অনীল তার বা পাশে তাকায়। তার স্ত্রী ঘুমাচ্ছে মুখ হা করে। গতকাল সারারাত
সে ঘুমোয় নি। ঘুমোয় নি বললে ভুল অর্থ করা হবে। আসলে সে ঘুমাতে পারেনি। শ্বাসকষ্ট নিয়ে
সারারাত বসে বসে কাটিয়েছে বেচারী। শুরুতে স্ত্রীকে কোনোভাবে সাহায্য করা যায় কি না
সে চেষ্ঠা করছিলো অনীল। এরপর একসময় সে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। ভোরবেলা একবার ঘুম ভাঙতেই সে
দেখলো তার স্ত্রী খাটে হেলান দিয়ে বসে আছে। চোখাচোখি হতেই স্ত্রীর ভেজা চোখ দেখলো সে।
সে চোখে সারারাতের গল্প লেখা ছিলো, কিংবা আরো বেশি কিছু।
এক বিষন্ন বর্ষার দিনে তাদের পরিচয়। বিশ্বসাহিত্য
কেন্দ্রের ছাদের এক কোণায় অনীল আবৃত্তি করছিলো, ‘কেউ জানে না
আমার কেন এমন হলো/ কেন আমার দিন কাটে না, রাত কাটে না; রাত কাটে তো ভোর দেখি না, কেন আমার হাতের মাঝে হাত থাকে না…’ তৃতীয় লাইনটা বলার সময় তার
সব এলোমেলো হয়ে গেলো। সামনের দিকে বসে থাকা একটা মেয়ে থমথমে, তীক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে একমনে
তার দিকে তাকিয়ে ছিলো। মেয়েটার পরনে ছিলো হলুদ কালারের জামা, সেখানে আসন্ন বসন্তের
ফুটতে যাওয়া সমগ্র ফুল সুপ্তাবস্থায় ছিলো। আর তার চোখে ছিলো ভারী ফ্রেমের চশমা। আবৃত্তি
শেষে মেয়েটা হাততালি দিলো, নিজের পরিচয় দিলো। আমি সাবরিনা। কথাটা বলে মেয়েটা
নিজের চশমা খুলে ফেললো, সেখান থেকে বেড়িয়ে এলো বিষন্ন দুটো চোখ। এই মুহূর্তটা পরবর্তীতে
বহুবার সে কল্পনায় দেখেছে। সম্ভবত সাবরিনা নামটার জন্যই মেয়েটাকে অড্রি হেপবার্নের
মতো লাগতে শুরু করে তার কাছে। ওদের দ্বিতীবারের মতো দেখা বেশ কয়েকমাস পর। এরপর আবার,
এরপর আবার। ততদিনে বর্ষা, শরত পেরিয়ে পাতা ঝরার মরশুম এসে গেছে। ওরা একসাথে শুকনো পাতা
ভাঙার শব্দ শোনে, ডিসেম্বরের শহরের ভেতর লুকিয়ে থাকা কান্না শোনে। শীত পেরিয়ে বসন্ত
এলে ওরা কৃষ্ণচুড়ার মধ্য দিয়ে হেটে যায়। এরপর আবারো বর্ষা আসে। একটা বৃত্তের ভেতর তারা
ঘুরতে থাকে। বৃত্তটা তৃতীয়বারের মতো চক্কর মারার পর তারা বিয়ে করে নেয়।
সাবরিনার শ্বাসকষ্টের ব্যাপারটা আগেই জানা
ছিলো, কিন্তু বিয়ের পর প্রথম যেদিন তাকে শ্বাসকষ্টে ভুগতে দেখে- সেদিন অনীল এর তীব্রতা
বুঝতে পারে। সেদিন সন্ধ্যার পর তাদের মধ্যে কিছুটা মান-অভিমান হয়। কথাবার্তা একপ্রকার
বন্ধই হয়ে যায়। রাতে চুপচাপ দুজন শুয়ে পড়ে। মাঝরাতে হঠাত ঘুম ভেঙ্গে গেলে অনীল দেখে
সাবরিনা বারান্দায় বসে আছে। হালকা আলোয় ওকে খুব ক্লান্ত দেখায়। অনীল খাট ছেড়ে কাছে
গিয়ে দাঁড়ায়। ‘কি হয়েছে?’ সে জানতে চায়। তার স্ত্রী চোখ তুলে তাকায়। সাবরিনা কিংবা
তার ব্যক্তিগত অড্রি হেপবার্নের সেই দৃষ্টি সে আর কখনো ভুলতে পারেনি। পরের দিন সাবরিনাকে
সাথে নিয়ে অনীল হাসপাতালে যায়। ডাক্তার সব শোনে, কিছু টেস্ট দেয়, কিছু পরামর্শ দেয়।
হাসপাতাল থেকে তারা ফেরার পথে রিকশা নেয়। সাবরিনা গুণগুণ করে গান গায়, তার খুব ভালো
লাগতে থাকে। রাস্তার পাশের এক নার্সারিতে সে রিকশা দাঁড় করায়। সাবরিনা সেখান থেকে একটা
হলুদ ফুলের গাছ কেনে, অলকানন্দা গাছ। গাছ নিয়ে তারা আবারো
রিকশায় উঠে। কি এক কথায় সাবরিনা হাসতে থাকে।
অনীলের সবকিছু খুব সুন্দর মনে হয়।
একদিন একদিন করে একটা সময় মাস, বছর কেটে যায়।
দুজনেই ব্যস্ত ভীষণ। সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসের জন্য ছোটা আর এরপর সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা।
এর মাঝে সপ্তাহান্তে পাওয়া ছুটির দিনটা ব্যবহৃত হয় স্ট্রেস কাটানোর কাজে। এক্ষেত্রে
দুজন দুই রকমের পথ খুঁজে নেয়। সাবরিনা চায় বাইরের আলো-বাতাস, ঢাকার ব্যস্ত রাস্তার
পাশের কোনো ক্যাফে আর পছন্দের মানুষদের সংগ। অনীল চায় নীরবতা, বই অথবা মুভি। এরপর আবারো
পরের সপ্তাহ শুরু, আবারো র্যাট-রেসে ডুব দেওয়া। এর মাঝে কখনো সাবরিনার বানানো কফি,
কখনো অলকানন্দা গাছে ফোটা নতুন ফুল জীবনে একটু আধটু রঙ এনে
দেয়। সেই রঙ ফিকে হতেও সময় নেয়না। আর এসবের সাথে সময়ের সাথে সাথে সাবরিনার শ্বাসকষ্টের
প্রকোপ বাড়তে থাকে। আবারো টেস্ট, আবারো ডাক্তারের কাছে ছোটা। রিপোর্টে তেমন কিছু বোঝা
যায়না। ডাক্তার তাই জানতে চান তাদের ঘরে এমন কোনো উপাদান আছে কী না যা শ্বাসকষ্টকে
ট্রিগার করে।
শ্বাসকষ্ট ব্যাপারটা অনীলের কাছে অপরিচিত
কিছু না। তার নিজেরও শ্বাসকষ্ট আছে। ছোটবেলা থেকেই; তবে খুব রেয়ার। হয়তো কয়েক বছর পর
তীব্র ভাবে একদিন শ্বাসকষ্টের সমস্যা হলো। বড় হবার পরেও তাই। শেষবারের মতো শ্বাসকষ্ট
হয়েছিলো অনেক দিন আগে। বিয়ের পর একবারো তার এ সমস্যা হয়নি। তাই ডাক্তারের সাথে সে একমত
হতে পারেনা। ঘরে কী থাকবে? মনে মনে
প্রশ্ন করে সে। তবু মুখে সে ডাক্তারকে ঘরের সব কিছুর বর্ণনা দেয়। শেষে মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস
করে, বারান্দায় থাকা গাছের এক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা থাকতে পারে কি না? কারণ সে খেয়াল
করেছে অলকানন্দা গাছটা আনার পর থেকে সাবরিনার শ্বাসকষ্টের
সমস্যাটা আগের চেয়ে বেশি হচ্ছে। পাশ থেকে সাবরিনা বিরক্তি নিয়ে তার দিকে তাকায়। ডাক্তার
কিছুক্ষণ ভ্রূ কুঁচকে ভাবতে থাকে, এরপর সে এই ধারণা উড়িয়ে দেয়। ‘এরকম হওয়ার সম্ভাবনা
নাই’, তিনি বলেন। এরপর তিনি কিছু ওষুধ লিখেন। সবশেষে তিনি সাবরিনার দিকে তাকান। ‘আপনি
একটা কাজ করেন। এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত পরামর্শ বলতে পারেন’ অনীল ও সাবরিনা দুজনেই
চেয়ে থাকে ডাক্তারের দিকে তার পরামর্শ শোনার জন্য।
আপনারা কোথাও ঘুরে আসেন কদিনের জন্য।
কোথায় ঘুরবো?
যেকোনো জায়গায় যেতে পারেন, সবুজের মাঝে। সেটা
জাফলং হতে পারে, কিংবা সাজেক।
অনীল আর সাবরিনার মধ্যে সেদিন আর তেমন কথা
হয়না। কোথায় যাওয়া যায়, কিভাবে ছুটি ম্যানেজ হবে, কিভাবে টাকা ম্যানেজ হবে- এতসব প্রশ্ন
আর চিন্তাভাবনা তাদের নিজ নিজ মাথায় গিজগিজ করতে থাকে। তবে খুব বেশি তাদের ভাবতে হয়না
কেননা পরের দিন সকালে সাবরিনা তার মোবাইলে একটা ইমেইল আবিষ্কার করে, আর অনীল ঘুম ভেঙ্গে
নিজেকে আবিষ্কার করে সাবরিনার বাহুডোরে। ‘ওরা ইমেইল করেছে, দেখো!’, সাবরিনার উচ্ছ্বসিত
কন্ঠ শোনা যায়। ‘স্কলারশিপ কনফার্ম। এই মাসের শেষের দিকে যেতে বলছে। সব রেডী আছে।’
সাবরিনা ইউ এস এর উদ্দেশ্যে উড়াল দেয় সে মাসের
ঊনত্রিশ তারিখ রাতের ফ্লাইটে। বহুদিন ধরে পিএইচডি করার জন্য স্কলারশিপের চেষ্ঠা করছিলো
সে। অবশেষে তার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। ইমেইল পাবার পরের কদিন তাদের সময় কাটে প্রচন্ড ব্যস্ততায়।
সবরকম কাগজপত্র রেডি করা, বিদেশযাত্রার জন্য কেনাকাটা, প্রিয় মানুষদের সঙ্গে দেখা করা-
এসব করতে করতে সময় গুলো পেরিয়ে যায়। তবু শেষদিকে সময়ের টানাটানি পড়ে যায়। তাইতো ফ্লাইটের
দিন তাদের গাড়ি যখন এয়ারপোর্টে পৌঁছায়, তখন প্রথমবারের মতো তারা দুজন আবিষ্কার করে
এই ব্যস্ততার মধ্যে তারা নিজেদের জন্য কোনো সময় বের করতে পারেনি। একটা চাপা অপরাধবোধ
তাদের দুজনকেই ঘিরে থাকে। এক সময় সাবরিনা নীরবতা ভাঙে। ‘আমার ফুল গাছ গুলোতে ঠিকঠাক
পানি দিও।’ অস্বস্তিকর নীরবতা ভাঙার আনন্দে অনীল প্রবলবেগে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়।
খাওয়া দাওয়ায় অনিয়ম করো না।
আচ্ছা। প্লেনে উঠে নেটওয়ার্ক থাকতে থাকতে
একটা কল দিও।
দিবো। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো, চিন্তা করো না।
আচ্ছা।
তারা দুজন দুজনের কাছ থেকে বিদায় নেয়। সাবরিনা
এয়ারপোর্টে ঢুকে যায়। অনীল বাড়ি ফেরার পথ ধরে।
অনেকদিন পর আবারো দুজনের ব্যাচেলর জীবন শুরু
হলো। দুজন পৃথিবীর দুই প্রান্তে নিজ নিজ অক্ষে ঘুরতে থাকে। সাবরিনার দিন কাটে নিজের
স্বপ্নের পিছে ছুটে, অনীলের দিন কাটে মাইটি পেপারের পিছে ছুটে। সারাদিন কাজ সেড়ে অনীল
তার শূন্য, অন্ধকার ঘরে এসে দাঁড়ায়। বিড়বিড় করে আবৃত্তি করে নির্মলেন্দুর কবিতা,
“আমি বলছি না
ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন আমার
জন্য অপেক্ষা করুক,
শুধু ঘরের ভেতর
থেকে দরোজা খুলে দেবার জন্য।
বাইরে থেকে
দরোজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত”
আবৃত্তিটা তার সাবরিনাকে শোনাতে ইচ্ছে করে।
কিন্তু সাবরিনাকে পাওয়া যায়না। কাজের চাপে তার রীতিমতো দিশেহারা অবস্থা। তবু নিয়ম করে
কিছু সময় তাদের কথা হয়। কথার মাঝে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে। শূন্য ঘরে, শূন্য বিছানায়
তাদের দীর্ঘশ্বাস ঘুরে-ফিরে বেড়ায়।
এর কদিন পর এক সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে খাওয়া
দাওয়ার পর অনীলের অল্প অল্প শ্বাসকষ্ট হতে থাকে। বেশ অবাক লাগে তার। অনেক দিন পর এমন
হলো। তার কিছুটা অস্বস্তি হয়। ঘুমানোর চেষ্ঠা করে, একসময় ঘুমিয়েও যায় সে। সকালে তার
সে কথা মনে থাকেনা। কিন্তু এর কদিন পর আবারো শ্বাসকষ্ট হয় তার, এরপর আবার, এরপর আবার।
ক্রমেই তার ধারণা পাকাপোক্ত হয়। সাবরিনাকে জিজ্ঞেস করেছিলো সে, ওখানে তার শ্বাসকষ্টের
সমস্যা হচ্ছে কী না। সে জানায় ইউ এস এ তে যাবার পর থেকে ওর একদিনও শ্বাসকষ্ট হয়নি।
অলকানন্দাটাই সব সমস্যার মূল। এই গাছটায় নিশ্চয়ই কোনো ঝামেলা আছে। ডাক্তাররা কি
সব জানে? কতকিছুই তো এখনো অজানা। এসব ভাবতে ভাবতে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়
অনীল। বিষদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে গাছটার দিকে। এরপর গাছটাকে উপড়ে তুলে বাসার পাশের
ড্রেনে ফেলে দিয়ে আসে।
এর কদিন পর প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে মাঝরাতে
ঘুম ভেঙে যায় অনীলের। সে বিছানায় বসে বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে থাকে। ঘরে ইনহেলার নেই। বারান্দায়
গিয়ে বসে অনীল। মোবাইলটা বের করে নেট অন করতেই সাবরিনার একগাদা মেসেজ দেখা যায়, সাথে
স্নোফলের কিছু ছবি। অনীল কল দেয় তাকে। সাবরিনা কল পেয়ে অবাক। ‘এখন অনেক রাত না? ঘুমাও
নাই তুমি?’
হঠাত ঘুম ভেঙ্গে গেলো। তুমি কি করছিলে?
আজকে তো ছুটি। এখানে খুব স্নো ফল হচ্ছে। আমরা
কজন ঘুরতে এলাম।
হঠাত অনীলের কি যেনো মনে হয়।
সাবরিনা, তোমার কী রিসেন্টলি শ্বাসকষ্ট হয়েছিলো?
না। এখানে আসার পর হয়নি একবারো। কেনো?
অনীলের একটা বইয়ের কথা মনে পড়তে থাকে। হুমায়ূন
আহমেদের একটা গল্প ছিলো এটি। গল্পে মেয়েটার হঠাত হঠাত শ্বাসকষ্ট হতো। তখন গল্পের নায়ক
একটা কথা বলেছিলো।
শ্বাসকষ্ট একটা মানসিক সমস্যা। মনের কষ্ট
থেকেই শ্বাসকষ্ট।
নিজের শূন্য ঘরের দিকে চেয়ে অনীল বড় বড় শ্বাস
নেয়, যেনো ক্রমেই সরু হয়ে আসতে থাকে ঘরটা। অলকনন্দা গাছটা ভেসে যেতে থাকে নর্দমার জলে।


Comments
Post a Comment